২০২৬ নির্বাচনের জন্য বৃহৎ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৬)

এই কর্মপরিকল্পনা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি। ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে এখানে এমন একটি ভবিষ্যৎ ভিশন তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে যুবসমাজ হবে পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি, অর্থনীতি হবে আরও বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী, এবং পররাষ্ট্রনীতি হবে বাস্তবসম্মত ও প্রভাবশালী।

১. অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ: স্থিতিস্থাপক ও আধুনিক প্রবৃদ্ধির পথ

বাংলাদেশকে একক খাতনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে বহুমুখী, নতুন সুযোগে ভরা এবং বিশ্বমানের একটি অর্থনীতিতে রূপান্তর করা এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য। এতে চাকরির সুযোগ বাড়বে, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝাঁকুনির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরক্ষা তৈরি হবে।


১.১. ডিজিটাল ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি: ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে সামনে রেখে আইটি/আইটিইএস খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা হবে।

লক্ষ্যমাত্রা:

  • ২০৩০ সালের মধ্যে আইটি/আইটিইএস রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলার
  • নতুন করে ১০ লক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান

কৌশল:

  • অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ: দেশব্যাপী ৫জি, আধুনিক ডেটা সেন্টার ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
  • স্টার্টআপ প্রণোদনা: নতুন আইটি ও ফিনটেক কোম্পানিকে প্রথম ৫ বছর সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা।
  • গবেষণা উন্নয়ন: বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত সংযোগ বাড়ানো, AI, ব্লকচেইন, মেশিন লার্নিং-এ বিশেষ বরাদ্দ।

১.২. রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ

পোশাক শিল্পের পাশাপাশি নতুন নতুন খাতকে রপ্তানির কেন্দ্রে আনা হবে।

লক্ষ্যমাত্রা:

  • রপ্তানির অন্তত ২০% পোশাক-বহির্ভূত খাত থেকে নিশ্চিত করা।

কৌশল:

  • নতুন খাতকে সমর্থন: ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিজ পণ্যপ্রক্রিয়াকরণে ভর্তুকি ও সহজ ঋণ।
  • কৃষি-শিল্প সংযোগ: হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে কোল্ড চেইন ও আধুনিক প্যাকেজিং।
  • ভ্যালু চেইন উন্নয়ন: কাঁচা চামড়ার বদলে জুতা, ব্যাগসহ প্রতিযোগিতামূলক তৈরি পণ্য রপ্তানির প্রসার।

১.৩. বিনিয়োগ আকর্ষণ: ব্যবসাবান্ধব বাংলাদেশ

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ, দ্রুত এবং স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করা হবে।

কৌশল:

  • এক-দরজা সেবা: সমস্ত বিনিয়োগ অনুমোদন ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা।
  • SEZ উন্নয়ন: গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি ফান্ড।
  • পুঁজিবাজার সংস্কার: বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা, বন্ড মার্কেটের প্রসার এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।

২. যুব-কেন্দ্রিক নীতি: দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্ব

যুবসমাজকে শুধু কর্মসংস্থানেই নয়, নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রেও আনা হবে, কারণ যুবরাই দেশের ভবিষ্যৎ।


২.১. ভবিষ্যৎ দক্ষতার বাংলাদেশ

শিক্ষাকে সরাসরি বাজারের চাহিদার সাথে যুক্ত করা হবে।

কৌশল:

  • TVET প্রশিক্ষণ: বছরে কমপক্ষে ৫ লাখ যুবককে প্রযুক্তি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ।
  • ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ।
  • বিদেশি ভাষা ট্রেনিং: স্প্যানিশ, জাপানিজ, চাইনিজ, জার্মান ভাষা শেখায় বিশেষ ভর্তুকি।

২.২. তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম

যুবাদের উদ্ভাবনই নতুন কর্মসংস্থানের উৎস।

কৌশল:

  • ফান্ডিং সুবিধা: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্টে করছাড়।
  • যুব শক্তি ঋণ: কম সুদে জামানত ছাড়া ঋণ।
  • ইনকিউবেশন সেন্টার: প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিশ্বমানের ইনকিউবেশন সেন্টার।
  • নিবন্ধন সহজীকরণ: স্টার্টআপ লাইসেন্সিং সম্পূর্ণ ডিজিটাল।

২.৩. সামাজিক ও মানসিক সুস্থতা

উৎপাদনশীল যুবসমাজের জন্য সুস্থ মানসিক পরিবেশ অপরিহার্য।

কৌশল:

  • মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক।
  • স্পোর্টস ও সংস্কৃতি: প্রতিটি পৌর এলাকায় স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও ডিজিটাল লাইব্রেরি।
  • মাদক প্রতিরোধ: জিরো টলারেন্স নীতি এবং কার্যকর পুনর্বাসন কর্মসূচি।

৩. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার: নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও নেতৃত্ব

বাংলাদেশকে একটি সক্রিয়, সমৃদ্ধ, এবং দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই লক্ষ্য।


৩.১. অর্থনৈতিক কূটনীতি

কৌশল:

  • নতুন বাণিজ্য চুক্তি: GCC, AfCFTA, ASEAN-এর সাথে FTA ও PTA সম্পন্ন।
  • অভিবাসী সুরক্ষা: বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক মিশন শক্তিশালী করা।
  • গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন: প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়ে শক্তিশালী লজিস্টিকস ও পরিবহন নেটওয়ার্ক।

৩.২. বৈশ্বিক নেতৃত্বে বাংলাদেশ

কৌশল:

  • জলবায়ু কূটনীতি: উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে বক্তব্য উত্থাপন ও সবুজ জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়ন আনা।
  • আঞ্চলিক সহযোগিতা: BIMSTEC ও IORA এর কার্যক্রমে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা।
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা: উচ্চমান ধরে রেখে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় অবদান।

৩.৩. প্রতিবেশী সম্পর্ক: আস্থা ও সহযোগিতা

কৌশল:

  • কানেক্টিভিটি: ভারত, নেপাল, ভুটানের সাথে বিদ্যুৎ গ্রিড এবং পরিবহন করিডোর।
  • জল ব্যবস্থাপনা: অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য জলবণ্টনে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

উপসংহার

এই সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা শুধু ২০২৬ নির্বাচনের জন্য একটি রাজনৈতিক রোডম্যাপ নয়—এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

  • অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ দেশের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।
  • যুবশক্তিকে কেন্দ্র করে নীতি প্রণয়ন প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন তৈরি করবে।
  • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার করবে জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অবস্থান।

এসব উদ্যোগ মিলেই গড়ে উঠবে একটি সমৃদ্ধ, সম্মানজনক এবং বিশ্বদরবারে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশ।