খামেনেই-পরবর্তী ইরান: গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা—একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন

খামেনেই-পরবর্তী ইরান: গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা—একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন

politicalinsightsbd
politicalinsightsbd

Ahmad Rafi Political Insights BD

আজ আমরা ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে উপনীত হয়েছি। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই-এর মৃত্যুর পর ইরানের কী হবে—এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে আমরা ইতিমধ্যে আইআরজিসি-র ক্রমবর্ধমান আধিপত্য, ‘গ্যারিসন ইকোনমি’র উত্থান, এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার চিত্র দেখেছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: খামেনেই-পরবর্তী ইরান কি কোনো একক, ঐক্যবদ্ধ নেতা তৈরি করতে পারবে? আরও বৃহত্তর পরিসরে, দেশটি কি কোনো উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারবে?

আমাদের গবেষণার এই ধাপে আমি একটি পরিষ্ক� বক্তব্য রাখতে চাই: ইরানে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কম। এটি হতাশাবাদের বিবৃতি নয়; বরং ক্ষমতা কাঠামো, ঐতিহাসিক নজির এবং বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন। স্টিমসন সেন্টারের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “খামেনেই মৃত্যুর পরেও ইরান একটি নতুন ঐক্যবদ্ধ নেতা বা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর আদৌ করতে পারবে কিনা তা অনিশ্চিত” ।

আসুন এই অনিশ্চয়তার পেছনের কারণগুলো বিস্তারিত বিশ্লেষণ করি।

১. কেন গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়: ক্ষমতা কাঠামোর বাস্তবতা

ক. আইআরজিসি-র ‘ডিপ স্টেট’ কাঠামো
খামেনেই গত তিন দশক ধরে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যেখানে কোনো নাগরিক বিকল্পের উত্থান সম্ভব নয় । রাষ্ট্রপতিদের দুর্বল করা হয়েছে, সংসদকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, এবং স্বাধীন ধর্মীয় কণ্ঠস্বরকে প্রান্তিক করা হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)। ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর বিশ্লেষক চার্বেল আন্তউনের ভাষায়, “যে প্রতিষ্ঠানগুলো খামেনেই-এর অধীনে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছে, সেগুলো হলো সংসদ, দল বা স্বাধীন আদালত নয়, বরং নিরাপত্তা রাষ্ট্র ও তার বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য” ।

খ. ‘দ্বি-পর্যায়ের উত্তরণ’ তত্ত্ব
খামেনেই-পরবর্তী ইরানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো একটি দ্বি-পর্যায়ের প্রক্রিয়া :

প্রথম পর্যায়: আইআরজিসি কমান্ডার ও শাসকগোষ্ঠীর উপদলগুলোর মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হবে। এটিকে ‘প্যালেস কুপ’ বা প্রাসাদ অভ্যুত্থানের পরবর্তী অবস্থা বলে মনে হবে, কোনো সাম্রাজ্যের পতন নয়। সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো রাতারাতি বিলীন হবে না।

দ্বিতীয় পর্যায়: এটি তখনই সম্ভব হবে যদি প্রথম পর্যায়ের সামরিক-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা দেশকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যর্থ হয়—অর্থাৎ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মর্যাদা বা পরিবর্তনের বিভ্রমও দিতে না পারে। তখন সাধারণ ইরানিরা একটি বাস্তব সুযোগ পেতে পারেন ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের।

অর্থাৎ, গণতন্ত্রের দরজা খুলতে হলে প্রথমে আইআরজিসি-র শাসনকে ব্যর্থ হতে হবে। এই ব্যর্থতার তিনটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে: নতুন করে গণবিক্ষোভ, শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ভাঙন, এবং আন্তর্জাতিক চাপ ।

২. ঐতিহাসিক নজির: কেন স্বৈরাচারের পতন মানে গণতন্ত্র নয়

কার্নেগি এন্ডোমেন্টের বিশিষ্ট গবেষক করিম সাজ্জাদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী বারবারা গেডেসের গবেষণা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বর্তমান পর্যন্ত স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ২৫ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরেকটি স্বৈরাচারই এসেছে

১৯৭৯ সালে ইরানের নিজস্ব বিপ্লব, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং আরব বসন্তের অধিকাংশ দেশের ফলাফল—সবই এই সত্যের সাক্ষী। জেমস বিল, ১৯৭৮-৭৯ সালে ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ লেখা তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে শাহ-পরবর্তী ইরানে সামরিক শাসন বা কমিউনিস্ট সরকার আসতে পারে। যা ঘটেছিল তা ছিল আয়াতুল্লাহ খোমেইনির নেতৃত্বে ইসলামী প্রজাতন্ত্র—একটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ফলাফল ।

ইতিহাসের এই শিক্ষা আমাদের সতর্ক করে: স্বৈরাচারের পতন একটি সুযোগ মাত্র, গণতন্ত্রের গ্যারান্টি নয়।

৩. পাঁচটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ: গণতন্ত্র কোথায়?

সাজ্জাদপুর খামেনেই-পরবর্তী ইরানের জন্য পাঁচটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিহ্নিত করেছেন :

মডেলবৈশিষ্ট্যগণতন্ত্রের সম্ভাবনা
রাশিয়া মডেলজাতীয়তাবাদী শক্তিমান ব্যক্তির উত্থান, ইসলামবাদ পরিবর্তে অভিযোগ-চালিত জাতীয়তাবাদনেই (স্বৈরাচার)
চীন মডেলব্যবহারিক স্বৈরাচার, অর্থনীতি উন্মুক্তকরণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কোন্নয়ননেই (দমন অব্যাহত)
উত্তর কোরিয়া মডেলধর্মীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, বিচ্ছিন্নতা, পারমাণবিক প্রতিরোধনেই (চরম স্বৈরাচার)
পাকিস্তান মডেলআইআরজিসি-র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শাসন, সামরিক প্রাধান্যনেই (প্রাইটোরিয়ান রাষ্ট্র)
তুরস্ক মডেলজনপ্রিয় গণতন্ত্রের আবরণ, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় প্রতীকের মিশ্রণসীমিত (অলিবারেল স্বৈরাচারের ঝুঁকি)

লক্ষণীয়, এই পাঁচটি সম্ভাব্য ভবিষ্যতের কোনোটি উদারনৈতিক গণতন্ত্র নয়। সবচেয়ে ‘উদার’ মডেল তুরস্কও ইরফান দোয়ান বা এরদোয়ানের তুরস্ক—যেখানে গণতন্ত্র আছে নামে, কিন্তু ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। সাজ্জাদপুর নিজেই স্বীকার করেছেন, “ইরানের সমাজ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু স্বৈরাচারী উত্তরণ কখনই জনপ্রিয়তা প্রতিযোগিতা নয়; এটি জবরদস্তির প্রতিযোগিতা” ।

৪. উত্তরণের পথে বাধা: প্রতিষ্ঠানিক অবরোধ ও সামরিক অর্থনীতি

স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক আরাশ রেজাইনেজহাদ ও আরশাম রেজাইনেজহাদ ইরানের বর্তমান সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন: “রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যে একটি গভীর প্রতিষ্ঠানিক অবরোধ” । ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ইরান একটি পথে হেঁটেছে যেখানে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছে, আর অস্বচ্ছ স্তরভিত্তিক কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এই ব্যবস্থায় চারটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়:

  1. সামরিক ও আধা-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক আধিপত্য: জিডিপির ৪০-৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসি ও বোনিয়াদগুলোর হাতে ।
  2. প্রতিযোগিতার দুর্বলতা: মুনাফা নির্ভর করে উদ্ভাবনের ওপর নয়, বরং প্রতিষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার, মুদ্রা সুবিধা, সরকারি চুক্তি এবং একচেটিয়া সুরক্ষার ওপর ।
  3. নিয়ন্ত্রক জটিলতা ও প্রতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতা: এগুলি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার এবং মুনাফা আহরণের ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে ।
  4. নিষেধাজ্ঞা থেকে লাভবান গোষ্ঠী: নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নেটওয়ার্ক, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক চ্যানেল থেকে যারা মুনাফা করে, তারা দীর্ঘমেয়াদী উত্তেজনাকে হুমকি নয় বরং মুনাফার সুযোগ হিসেবে দেখে ।

হাডসন ইনস্টিটিউটের কান কাসাপোগ্লু আরও গভীরে গিয়ে বলেছেন, “ইরানের নিরঙ্কুশ শাসন পরিবর্তন রাস্তায় নয়, বরং কোষীয় স্তরে ঘটছে—একটি শারীরবৃত্তীয় পতন যা মতাদর্শ বা দমন-পীড়নের ঊর্ধ্বে” । খামেনেইর জৈবিক মৃত্যু একটি অনিবার্য সত্য। কিন্তু সেই মৃত্যুর পর আইআরজিসি আরও বেশি ক্ষমতা দাবি করবে।

৫. সামাজিক চুক্তির ভাঙন: গণতন্ত্রের বিকল্প কী?

ইরানের তরুণ প্রজন্মের সাথে শাসকগোষ্ঠীর সামাজিক চুক্তি অপরিবর্তনীয়ভাবে ভেঙে গেছে । জরিপ সংস্থা গামানের (GAMAAN) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মাত্র ১৬-২০ শতাংশ মানুষ মৌলবাদী শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে, আর ৭০-৮০ শতাংশ এর বিরোধী । ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভে ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে (শুধু ১০% হাসপাতালের তথ্যের ভিত্তিতে, প্রকৃত সংখ্যা হাজারের ওপরে) ।

কিন্তু এই বিশাল অসন্তোষ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্র আনবে? ইতিহাস বলে না। নর্থ কোরিয়ার ১৯৯০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ, স্তালিন-যুগের সোভিয়েত দুর্ভিক্ষ, হাফেজ আল-আসাদের সিরিয়া—এগুলি প্রমাণ করে যে “একটি সংগঠিত সংখ্যালঘু প্রজন্মের পর প্রজন্ম অসন্তুষ্ট জনতার ওপর জয়ী হতে পারে” ।

উপসংহার: ‘মুক্তি’ বিলম্বিত হবে, কিন্তু কি চিরতরে?

ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর বিশ্লেষণে একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা আছে: “অনেকে কল্পনা করেন খামেনেই-পরবর্তী দিনটি হঠাৎ মুক্তির মুহূর্ত হবে—ইরানিরা মোল্লাদের ঝেড়ে ফেলে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করবে। কিন্তু সম্ভাব্য প্রথম দৃশ্যটি অনেক কম রোমান্টিক” ।

খামেনেইর মৃত্যুকে ‘মুক্তি’ বলাটা প্রথম পর্যায়কে এড়িয়ে যাওয়া। শীর্ষের লোকটি যেতে পারেন, কিন্তু তিনি যে গভীর রাষ্ট্র গড়ে গেছেন, সেটি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছে পোষণ করে । সিয়ামক নামাজির পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য: “ইরান আজ প্রতিদ্বন্দ্বী মাফিয়াদের একটি সংগ্রহ—আইআরজিসি ও তার স্নাতকদের দ্বারা প্রভাবিত—যাদের সর্বোচ্চ আনুগত্য দেশ, ধর্ম বা মতাদর্শের প্রতি নয়, বরং ব্যক্তিগত সম্পদের প্রতি” ।

শেষকথা: খামেনেই-পরবর্তী ইরানে গণতন্ত্র সম্ভব, তবে তা হবে প্রথম পর্যায়ের আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ব্যর্থতার পরে—দ্বিতীয় পর্যায়ে। আর সেই দ্বিতীয় পর্যায় আসবে কিনা, তা নির্ভর করবে তিনটি শক্তির ওপর: গণবিক্ষো�ের ধারাবাহিকতা, শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ভাঙন, এবং আন্তর্জাতিক চাপের মাত্রা। যে ইরানিরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে চান, তাঁদের জন্য অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, স্বৈরাচারের পতন কখনো কখনো হঠাৎ ঘটে, যখন কেউ তা আশা করেনি। সেই আকস্মিকতা ইরানের জন্যও অপেক্ষা করছে কিনা—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অজানা।

Share:
politicalinsightsbd
Written by

politicalinsightsbd

Author at Political Insights BD.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top