আইসিটি বিভাগে ঘটে যাওয়া কিছু কাজ, যার প্রভাব সারাজীবন থেকে যাবে …..

যে যুদ্ধের কথা আমরা জানি না: ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের নীরব বিপ্লব

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। কিন্তু একটা যুদ্ধের কথা আমরা জানতামই না—ডিজিটাল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যে যুদ্ধ চলছে নীরবে, কোড আর নীতিমালার পাতায়। যে যুদ্ধে জয়ী না হলে, রাস্তার স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে যেত।

আজ থেকে দেড় বছর আগে, আপনার প্রতিটি ফেসবুক পোস্ট, প্রতিটি মেসেঞ্জার চ্যাট, প্রতিটি গুগল সার্চ—সবকিছু ছিল এক অদৃশ্য জালের মধ্যে। একটি জাল যেখানে প্রতিটি সুতোর ওপাশে বসে আছে একটি নজরদারি রাষ্ট্র। আর এই জালটি ছিঁড়ে ফেলার কাজটি করছেন একজন মানুষ—ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তাঁর নাম হয়তো আপনি শোনেননি, কিন্তু তিনি যা করছেন, সেটা না হলে আগামীর বাংলাদেশ হতে পারত আরেকটি চীন বা উত্তর কোরিয়া।

যে দুঃস্বপ্ন আমরা দেখিনি

কল্পনা করুন একটা সকাল। সকাল ৭টা। আপনার মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন। পুলিশের সমন। অভিযোগ: আপনি গতকাল রাতে ফেসবুকে শেয়ার করা একটি পোস্টে “সরকারবিরোধী প্রচারণা” করেছেন। কোন পোস্ট? আপনার মনেও নেই। হয়তো একটা মিম শেয়ার করেছিলেন। হয়তো কোনো খবর। হয়তো একটা কৌতুক।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট—আপাতদৃষ্টিতে একটি নিরীহ আইন। কিন্তু এর ৯টি ধারা ছিল এক একটি গিলোটিন। ধারা ২৫, ২৮, ৩১, ৩২, ৩৫—এই সংখ্যাগুলো মনে রাখার দরকার নেই। শুধু জানুন, এই ধারাগুলো দিয়ে বিনা ওয়ারেন্টে আপনার ঘর তল্লাশি করা যেত, বিনা অভিযোগে আপনাকে ৬ মাস আটক রাখা যেত, বিনা প্রমাণে আপনার ডিভাইস জব্দ করা যেত, বিনা বিচারে আপনার জীবন শেষ করা যেত।

২০১৮ থেকে ২০২৪—এই ছয় বছরে DSA-তে ১,৫০০ এর বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ছিল সাংবাদিক, লেখক, ছাত্র, এবং সাধারণ নাগরিক। কোনো জঙ্গি নয়, কোনো হ্যাকার নয়—শুধুমাত্র মত প্রকাশ করেছিলেন বলে।

আপনি জানেন না, কিন্তু ২০২০-২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার কিনেছিল FinFisher—একটি সফটওয়্যার যা আপনার ফোনে ট্রোজান ইনস্টল করে সব কিছু দেখতে পারে, হোয়াটসঅ্যাপ, সিগনাল, এমনকি ডিলিট করা মেসেজও। Deep Packet Inspection—আপনার ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রতিটি বাইট মনিটর করার সিস্টেম। Social Media Monitoring Tools—সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কী বলছে তা রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করার এআই সিস্টেম।

এই সিস্টেমগুলো পুরোপুরি চালু ছিল। একটি উদাহরণ দিই: ২০২২ সালের মার্চ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র একটি প্রাইভেট WhatsApp গ্রুপে একটি রাজনৈতিক কৌতুক শেয়ার করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কীভাবে জানল সরকার? কারণ তার ফোন ট্যাপ করা ছিল।

এটাই ছিল আমাদের বাস্তবতা। Big Brother শুধু দেখছিল না—সে রেকর্ড করছিল, বিশ্লেষণ করছিল এবং মামলা করছিল।

মানুষের ভয়ঙ্কর উদাসীনতা

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যেটা—মানুষ এই নজরদারিকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেছিল। যখনই প্রাইভেসির কথা বলতেন কেউ, জবাব আসত: “আমি তো অপরাধী না, আমার কী সমস্যা?” “সরকার তো ভালোর জন্যই করছে।” “ডিজিটাল যুগে প্রাইভেসি বলে কিছু নেই।” “আমেরিকাও তো এটা করে।”

এই মানসিকতাটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিপদ। নজরদারিকে স্বাভাবিক মনে করা।

তরুণ প্রজন্ম, যারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে বড় হয়েছে, তারা মনে করত প্রাইভেসি একটি পুরনো ধারণা। “আমরা তো সব শেয়ার করিই, তাতে কী?” কিন্তু পার্থক্য হলো: Facebook-এ আপনি নিজে শেয়ার করেন, সরকার জোর করে নেয়। Social media-তে আপনি ছবি দেন, সরকার আপনার ব্যাংক, মেডিকেল, লোকেশন সব জানে। আপনি পোস্ট ডিলিট করতে পারেন, কিন্তু সরকারের কাছে সারা জীবনের রেকর্ড থাকে।

সবচেয়ে লজ্জার বিষয়—শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা নিজেরাই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, তারাই এই বিষয়ে সবচেয়ে নীরব ছিলেন। কারণ ভয়: “আমার চাকরি চলে যাবে।” স্বার্থ: “আমি তো সরকারি সুবিধা পাচ্ছি।” অজ্ঞতা: “এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই।”

২০২৩ সালে যখন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের নজরদারি নিয়ে রিপোর্ট করে, বাংলাদেশি টেক কমিউনিটির ৮০ শতাংশের বেশি কোনো প্রতিক্রিয়াই দেয়নি। কেন? কারণ সবাই জানত, প্রতিবাদ করলে পরিণতি কী।

পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতা

কল্পনা করুন, আপনি একটি আইন পরিবর্তন করতে চান। কিন্তু সেই আইন তৈরি করেছে সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য, সেই আইন প্রয়োগ করছে পুলিশ যারা এটা দিয়ে সহজে লোক ধরতে পারে, সেই আইন সমর্থন করছে গোয়েন্দা সংস্থা যাদের বাজেট এটা দিয়ে বাড়ে, সেই আইন রক্ষা করছে বিচার বিভাগ যারা নিজেরাই সরকারের চাপে আছে।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব যখন DSA সংস্কারের কথা বলেন, তখন তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের—”আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাবে,” ডিজিএফআই/এনএসআই-এর—”জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে,” বিটিআরসি-এর—”আমাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যাবে,” আইসিটি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার—”আমাদের প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে।”

প্রাইভেসি আইন শুধু কাগজে লিখলেই হয় না, সেটা প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ নেই বললেই চলে। সরকারি সার্ভারগুলো পুরনো ও অসুরক্ষিত। ডেটা স্টোরেজ বিকেন্দ্রীকৃত নয়—সব এক জায়গায়। এনক্রিপশন স্ট্যান্ডার্ড নেই। তার মানে, আইন করলেও বাস্তবায়ন করার লোক নেই।

প্রাইভেসি সংস্কার মানে পুলিশের ক্ষমতা কমে যাওয়া, গোয়েন্দা বাজেট কমা, সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমা, বিদেশি সংস্থার ডেটা অ্যাক্সেস বন্ধ। তৈয়্যবকে একই সাথে লড়তে হচ্ছে দেশের ভেতরের শক্তিশালী লবি, বাইরের বহুজাতিক কোম্পানি যারা বাংলাদেশি ডেটা চায়, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা।

অন্তর্বর্তী সরকার সাময়িক। যেকোনো মুহূর্তে নির্বাচন হতে পারে। নতুন সরকার এলে সব আবার উল্টে যেতে পারে। তাই তৈয়্যবের হাতে সময় খুবই কম। তাঁকে ৬ মাসে সংস্কার ড্রাফট করতে হবে, ১ বছরে আইন পাস করাতে হবে, ২ বছরে বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। কিন্তু সরকার থাকবে কতদিন? কেউ জানে না।

মানুষ বুঝছে না এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যখন তিনি স্টারলিংক গাইডলাইন নিয়ে এলেন, প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল: “সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করার নতুন ক্ষমতা পেল!” তাঁকে Facebook-এ দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। কিন্তু কতজন পড়েছে? কতজন বুঝেছে? প্রাইভেসি সংস্কার একটা thankless job—মানুষ দেখতে পায় না, বুঝতে পারে না, মূল্যও দেয় না।

নীরব বিপ্লব—যা তিনি করেছেন

২০২৪ সালের নভেম্বর। একটি নির্বাহী আদেশে DSA-এর সবচেয়ে বিতর্কিত ৯টি ধারা বাতিল হলো। এটা শুনতে সহজ মনে হচ্ছে? এর জন্য তৈয়্যবকে ৫০ এর বেশি বৈঠক করতে হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে, ১০০ এর বেশি পৃষ্ঠার আইনি যুক্তি তৈরি করতে হয়েছে, আন্তর্জাতিক চাপ আনতে হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ থেকে, প্রধান উপদেষ্টাকে বোঝাতে হয়েছে এটা কতটা জরুরি।

ফলাফল? এখন বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা যাবে না। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন লাগবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পেতে পারবেন। ভুল অভিযোগে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন। এটা ছোট মনে হচ্ছে? ২০২৩ সালে যে দেশে একটা পোস্টের জন্য ৬ মাস জেল, সেই দেশে এটা বিশাল পরিবর্তন।

নতুন সাইবার অর্ডিন্যান্সে একটি বিপ্লবী ধারা যুক্ত হয়েছে: সরকার যদি কোনো ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট ব্লক করে, তাহলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জনসমক্ষে কারণ প্রকাশ করতে হবে, কোন আইনের ভিত্তিতে ব্লক করা হলো তা জানাতে হবে, নাগরিকরা আদালতে আপিল করতে পারবেন, আদালত স্বাধীনভাবে পুনর্বিবেচনা করতে পারবেন।

এর মানে কী? সরকার এখন গোপনে Facebook page বন্ধ করতে পারবে না। Blanket ban যেমন সব YouTube block দিতে পারবে না। জনগণ জানবে কেন কী বন্ধ হলো। এটা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশেও নেই। এশিয়ায় শুধু ভারত আর দক্ষিণ কোরিয়ায় আছে।

বাংলাদেশ GDPR-আদলে ডেটা প্রোটেকশন আইন তৈরি করছে। এটা হলে Facebook আপনার ডেটা দেশের বাইরে নিতে পারবে না আপনার সম্মতি ছাড়া। Google-কে আপনার সার্চ হিস্ট্রি মুছতে বাধ্য করতে পারবেন। সরকারি হাসপাতাল আপনার মেডিকেল রেকর্ড বিক্রি করতে পারবে না। টেলিকম কোম্পানি আপনার লোকেশন ডেটা শেয়ার করতে পারবে না আদালতের আদেশ ছাড়া।

এটা যদি পাস হয়, বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ যেখানে সম্পূর্ণ ডেটা প্রাইভেসি আইন আছে। ভারতেও এখনো পাস হয়নি।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৪টি ইন্টারনেট শাটডাউন হয়েছিল জুলাই-আগস্টে। অর্থনৈতিক ক্ষতি: দেড় বিলিয়ন ডলার। তৈয়্যব একটি চার-স্তরের পরিকল্পনা করেছেন। প্রথম স্তর: প্রযুক্তিগত বিকল্প—স্টারলিংক লাইসেন্স এখন চালু, মেশ নেটওয়ার্কস পাইলট প্রজেক্ট, একাধিক আন্ডারসি ক্যাবল এখন ৩টা, আরও ২টা আসছে।

দ্বিতীয় স্তর: আইনি বাধা—ইন্টারনেট শাটডাউন শুধু জাতীয় জরুরি অবস্থায় সম্ভব, আদালতের অনুমোদন লাগবে, ৪৮ ঘণ্টার বেশি বন্ধ রাখা যাবে না, সংসদে রিপোর্ট দিতে হবে।

তৃতীয় স্তর: অপারেটর প্রোটেকশন—টেলিকম কোম্পানি সরকারি নির্দেশ অস্বীকার করতে পারবে যদি আইনবিরোধী হয়, সরকার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে, অপারেটররা জনসমক্ষে শাটডাউনের কারণ প্রকাশ করবে।

চতুর্থ স্তর: জরুরি সংযোগ—সাংবাদিক, ডাক্তার, এনজিওদের বিশেষ লাইন বন্ধ হবে না, Embassy, UN অফিসের সংযোগ সবসময় চালু। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে comprehensive ইন্টারনেট ফ্রিডম পলিসি। এমনকি ইউরোপেও এতটা বিস্তারিত নেই।

প্রথমে সমালোচনা হলো: “স্টারলিংক মানে Elon Musk বাংলাদেশের ডেটা পাবে!” তৈয়্যব গাইডলাইন সংশোধন করে ৫টি শর্ত যুক্ত করেন: Local Data Center—বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের ডেটা দেশে স্টোর করতে হবে। No Mass Surveillance—সরকার bulk data পাবে না। Judicial Warrant—নির্দিষ্ট ব্যক্তির ডেটা চাইলে আদালতের অনুমোদন লাগবে। Transparency Report—প্রতি ৬ মাসে সরকারি অনুরোধের তালিকা প্রকাশ। Community Distribution—WiFi Lady মডেলে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিতরণ যেন সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করে। এটা এতটাই ভালো যে EU আর ভারতও এই মডেল দেখছে।

বেশিরভাগ দেশ AI ব্যবহার করে ফেলে, তারপর সমস্যা হয় তারপর আইন করে। বাংলাদেশ উল্টো পথে যাচ্ছে—আগেই নীতি তৈরি করছে। সরকারি AI ব্যবহারে ৫টি মূলনীতি: Transparency—কোথায় AI ব্যবহার হচ্ছে তা জনগণকে জানাতে হবে। Explainability—AI কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা ব্যাখ্যা করতে হবে। Human Override—গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের চূড়ান্ত অনুমোদন। Bias Audit—প্রতি ৬ মাসে AI-এর বৈষম্য পরীক্ষা। Right to Appeal—AI-এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার।

উদাহরণ: যদি পুলিশ AI দিয়ে “সন্দেহজনক ব্যক্তি” খুঁজে বের করে, তাহলে জনগণ জানবে AI ব্যবহার হচ্ছে, AI কীভাবে সিদ্ধান্ত নিল তা বলতে হবে, আপনি যদি “সন্দেহজনক” তালিকায় পড়েন আপিল করতে পারবেন, AI-ই গ্রেপ্তার করতে পারবে না, মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে। এটা চীনের AI নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত—যেখানে AI নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু, কোনো প্রশ্ন করা যায় না।

কেন এটা বিশাল ব্যাপার

চীন: ২ বিলিয়ন CCTV ক্যামেরা। সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম। ১ মিলিয়ন উইঘুর মুসলিম ডিজিটাল নজরদারিতে। এটা হতে পারত বাংলাদেশ।

রাশিয়া: বিরোধী রাজনীতিবিদদের ফোন ট্যাপ। ইন্টারনেট বন্ধ। যুদ্ধবিরোধী পোস্টে ১৫ বছরের জেল। এটা হতে পারত বাংলাদেশ।

মিয়ানমার: ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থান। ইন্টারনেট ৩ মাস বন্ধ। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। এটা হতে পারত বাংলাদেশ।

কিন্তু এখন বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মুক্ত ডিজিটাল স্পেস, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার চেয়ে এগিয়ে, EU-এর কাছাকাছি মান।

প্রাইভেসি সংস্কারের অর্থনৈতিক সুবিধা: Google, Microsoft, Amazon data center তৈরি করতে আসবে শুধু যদি ডেটা প্রোটেকশন আইন থাকে—সম্ভাব্য বিনিয়োগ ২-৩ বিলিয়ন ডলার পরবর্তী ৫ বছরে। EU-তে রপ্তানি করতে GDPR compliance লাগে—বাংলাদেশি IT কোম্পানি এখন সেই মান পূরণ করতে পারবে—সম্ভাব্য রপ্তানি বৃদ্ধি ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রতি বছর। পশ্চিমা পর্যটকরা নজরদারি রাষ্ট্রে যেতে চায় না—ডিজিটাল রাইটস উন্নত হলে safe destination হিসেবে ব্র্যান্ডিং—সম্ভাব্য আয় বৃদ্ধি ১০০-২০০ মিলিয়ন ডলার প্রতি বছর। বাংলাদেশি টেক পেশাদাররা দেশ ছাড়ছেন কারণ এখানে freedom of expression নেই—প্রাইভেসি সংস্কার হলে তারা দেশে থাকবেন—সম্ভাব্য সাশ্রয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানব পুঁজি ধারণ।

সামাজিক প্রভাব: সাংবাদিকরা ভয় ছাড়া কাজ করতে পারবেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফিরে আসবে, দুর্নীতি উন্মোচন সহজ হবে। যুবকরা স্যাটায়ার, মিম, কৌতুক করতে পারবেন গ্রেপ্তারের ভয় ছাড়া, সামাজিক সমালোচনা স্বাভাবিক হবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি mature হবে। পূর্ববর্তী সরকার নারী অ্যাক্টিভিস্টদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করত—ডেটা প্রোটেকশন আইন এটা অসম্ভব করে দেবে—নারীরা fearless হয়ে রাজনীতিতে আসতে পারবেন।

এখনো যে বিপদ বাকি

আইন করা আর বাস্তবায়ন করা—এক জিনিস নয়। পুলিশ অফিসারদের ডিজিটাল রাইটস বোঝানো কঠিন। ম্যাজিস্ট্রেটরা টেকনিক্যাল বিষয় বোঝেন না। ডেটা প্রোটেকশন অফিসার তৈরি করতে ৩-৫ বছর লাগবে।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার সব বাতিল করতে পারে। রাজনৈতিক দল এসব সংস্কার নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। আইনটা থাকবে কিনা—অনিশ্চিত।

আমেরিকা চায় বাংলাদেশি টেরর সন্দেহভাজনদের ডেটা বিনা ওয়ারেন্টে। চীন চায় নিজেদের প্রযুক্তি যা নজরদারি-বান্ধব। ভারত চায় সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে।

২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী ৭০ শতাংশ বাংলাদেশি জানেন না ডেটা প্রাইভেসি কী, ৮৫ শতাংশ কখনো Privacy Settings পরিবর্তন করেননি, ৯০ শতাংশ জানেন না তাদের কী কী অধিকার আছে। এটা পরিবর্তন না হলে, সংস্কার কাগজেই থেকে যাবে।

একজন মানুষ, একটি লড়াই

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব হয়তো একটা বড় পদে নেই। হয়তো তাঁর নাম পত্রিকার প্রথম পাতায় আসে না। হয়তো তাঁকে নিয়ে মিডিয়ায় তেমন আলোচনা হয় না।

কিন্তু তিনি যা করছেন, সেটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রভাবিত করবে।

আজ থেকে ২০ বছর পর, যখন আপনার সন্তান স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করবে, যখন সে জানবে তার ডেটা সুরক্ষিত, যখন সে বুঝবে মত প্রকাশের মানে জেল নয়—তখন মনে রাখবেন এই মানুষটার নাম।

এটা রাজনীতি নয়, এটা সভ্যতার লড়াই। ডিজিটাল বর্বরতা বনাম ডিজিটাল সভ্যতা। আর এই লড়াইয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আমাদের সবার হয়ে লড়ছেন।

আমরা রাস্তায় রক্ত দিয়ে স্বৈরাচার পতন করেছি। তিনি নীরবে কোড আর আইন দিয়ে ডিজিটাল স্বৈরাচার ভাঙছেন।

দুটো লড়াই। একটি দৃশ্যমান, একটি অদৃশ্য। কিন্তু দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।


প্রকাশনা: Political Insights BD
তারিখ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬